আজ ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৮:২৮

কক্সবাজার ৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে বিতর্ক

অভিযোগের মুখে সাবেক সাংসদ লুৎফুর রহমান কাজল

লুৎফুর রহমান কাজল
লুৎফুর রহমান কাজল, সাবেক সংসদ সদস্য, কক্সবাজার ৩ ও মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজার ৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য ও দলের মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজলের মনোনয়ন নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশ, বিভিন্ন মামলার নথি, তদন্ত সংক্রান্ত দাবি ও গোয়েন্দা সূত্রের বক্তব্যের বরাতে একাধিক অভিযোগ ওঠায় তার মনোনয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক, এলাকাবাসীর একটি অংশ এবং একাধিক ব্যক্তির দাবি, লুৎফুর রহমান কাজল এবং তার পরিবার কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে দখলবাজি, লবণ ও সার চোরাচালান, পাহাড় ও বন ধ্বংস, চিংড়ি প্রজেক্টে হামলা, সরকারি খাসজমি দখল, হোটেল দখলচেষ্টাসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত।

তাদের অভিযোগ, কাজল উত্তরাধিকারসূত্রে কুখ্যাত ‘নিরিবিলি সিন্ডিকেট’ এর পরবর্তী নিয়ন্ত্রক হিসেবে উঠে এসেছেন। এই সিন্ডিকেটের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্থানীয়ভাবে কাজলের বাবা মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমানকে চিহ্নিত করা হয়, যাকে কিছু স্থানীয় ব্যক্তি ‘চোরাচালানের গডফাদার’ বলে অভিহিত করে থাকেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কাজল বা তার পরিবারের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১৫ বছরে লুৎফুর রহমান কাজল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র মুজিবুর রহমান এর ঘনিষ্ঠতার কারণে রাজনৈতিক ও আইনগত সুবিধা পেয়েছেন। তাদের দাবি, একাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও তিনি নির্বিঘ্নে রাজনীতি চালিয়ে গেছেন এবং ৫ আগস্টের ঘটনার পর মুজিবুর রহমানকে এলাকা ছাড়তেও সাহায্য করেন যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও স্থানীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, কাজলের নাম পাঁচ তারকা হোটেল রামাদা, ‘হোটেল বে কুইন’, ‘হোয়াইট বিচ’, ‘বসতি বে রিসোর্ট’ দখলচেষ্টার সঙ্গে একাধিকবার উঠে এসেছে। গত ১৫ অক্টোবর ‘হোটেল বে কুইন’ দখলের ঘটনায় বিএনপির কয়েকজন নেতা ও শতাধিক সশস্ত্র ব্যক্তির অংশগ্রহণের অভিযোগ আসে, যেখানে কাজলকে ‘নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

এছাড়া প্রবাসী ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনকে নিয়ে কুৎসা রটানো, তাকে ‘পর্যটন শিল্পের জন্য হুমকি’ আখ্যা দিয়ে মিছিল পরিচালনা, এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও স্থানীয়দের একাংশ করেছে। তবে এসব বিষয়ে কাজলের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিবেশবিষয়ক একাধিক সংস্থার কর্মকর্তাদের দাবি, ২০০৮ সালে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে কক্সবাজারে পাহাড় কাটার ঘটনা নতুন মাত্রা পায়। বনবিভাগের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কাজলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আশ্রয়ে ইসলামপুর, ঝিলংজা ও ঈদগাঁও এলাকায় পাহাড়, টিলা ও বনভূমি দখল বিনষ্ট হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং কাজলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সরকারি বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

২০২২ সালের ৬ জুন দাখিল হওয়া একটি মামলায় উল্লেখ করা হয়, কাজল ও তার ভাই মশিউর রহমান রাজন পূর্ব গোমাতলির এক চিংড়ি প্রজেক্টে হামলা, গুলি চালানো, ক্ষতি সাধন এবং বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে লাখ লাখ টাকার মাছ নষ্ট করার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। মামলাটি বিচারাধীন, ফলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে আদালতের চূড়ান্ত মত এখনো জানা যায়নি। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি অভিযোগ করেন, ওবায়দুল হক গং এবং হাফেজ আহমদ গং এর ৪০০ একরেরও বেশি লবণমাঠ ও চিংড়ি ঘের ৯০ এর দশক থেকে জবরদখল করা হয়েছে, যার পেছনে ‘নিরিবিলি গ্রুপ’ ও পরবর্তীতে কাজলের ভূমিকা রয়েছে বলে তাদের দাবি। এ বিষয়ে কোনো আইনি নথি বা কাজলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজার ৩ আসনের বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের মধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী গণ অভ্যুত্থানের পর তারা কোনোভাবেই ‘ফ্যাসিস্ট প্রবণতা ও দখলদারিত্বে জড়িত’ ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চান না। তাদের মতে, বিএনপি জনগণের প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিকে বিবেচনায় না নিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়ে “অপরাধের পুরস্কার” দিয়েছে।

বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। দলীয় একটি সূত্র জানায়, কাজল দলের দীর্ঘদিনের সক্রিয় কর্মী এবং সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় তাকে পুনরায় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, মনোনয়ন যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর হওয়া দরকার ছিল, বিশেষ করে এমন আসনে যেখানে আইনশৃঙ্খলা ও পর্যটন শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বশেষ খবর

Scroll to Top