আজ ২২শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ২:১৪
জুলাই ২৪ গণআন্দোলন ও বাংলাদেশ

ফ্যাসিস্ট দোসরদের পুনর্বাসন প্রকল্প

জুলাই গণআন্দোলনের পর বাংলাদেশের ক্ষমতার নেপথ্য রাজনীতি

বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই ২৪ এর গণআন্দোলন কেবল একটি রাজনৈতিক অভ্যুত্থান নয়, এটি ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল রাষ্ট্র আর ফ্যাসিবাদী কাঠামোর অধীনে চলতে পারে না। আর তাই আন্দোলনে শরিক হতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, যুবক, বৃদ্ধ, বনিতা, ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষ। মায়েরা তার সন্তানকে বন্দুকের গুলির মুখে এগিয়ে দিয়েছিলেন, স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা রাস্তায় নেমেছিলেন সকল জঞ্জালকে হটিয়ে নিরাপদ শহর বিনির্মানে। নিয়েছিলেন ট্রাফিক কস্ট্রোলেরও দ্বায়িত্ব যাতে সাধারন মানুষের দৈনন্দিন জীবন আটকে না যায়।গৃহিনীরা খাবার পানি নিয়ে ছুটেছিলেন অভুক্ত তৃষণার্ত আন্দোলনকারী সন্তানদের মুখে খাবার ও পানি তুলে দিতে। বাবারা তার সন্তানদেরকে সাথে নিয়ে হেটেছিলেন মাইলের পর মাইল। আবু সাঈদেরা বুক পেতে দিয়েছিলেন বন্দুকের গুলির মুখে। আর মুদ্ধরা পানির বতল হাতে পানি পানি বলে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আর তাইতো তাদের হাত ধরেই ধরা দিয়েছেল স্বপ্নের নতুন স্বাধীনতা। দল-বল, ধর্ম-বর্ণ মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল সকল মানুষ। সকলে মিলে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, অর্ধ শত বছরের পর হলেও এবার বুঝি তারা ফিরে পাবেন তাদের স্বপ্নের সেই স্বাধীনতা। কিন্তু কোথায় সেই কাঙ্খিত স্বাধীনতা?

আন্দোলনের পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতার দৃশ্যপট বদলালেও ক্ষমতার চরিত্র ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। বরং বলা যায়, জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই ফ্যাসিবাদী শাসনের দোসরদের টিকিয়ে রাখার একটি সুপরিকল্পিত ও বহুস্তরীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

গণআন্দোলনের অব্যবহিত পরেই একটি বিপ্লবী বা সংস্কারমুখী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই পথ এড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশকে তথাকথিত নিয়মিত সরকারের কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা হলো। এর ফলে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও কূটনৈতিক কাঠামো সবখানেই ফ্যাসিবাদী আমলের রেখে যাওয়া সেটআপ অক্ষতই রয়ে গেল। ফ্যাসিস্ট দোষরদের সম্মূখসারির আমলা-কামলারা সেনাবাহিনীর কতিপয় দোষরদের সহায়তায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো আর বাকীরা রয়ে গেল ধরা ছোয়ার বাহিরে। নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় সুবিধাভোগী আমলা, রাজনৈতিক দোসর ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোকে বাদ দেয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা গেল না বরং প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তাদেরকে ‘অভিজ্ঞতা’ ও ‘স্থিতিশীলতা’র অজুহাতে বহাল রাখা হলো। বিপ্লবী সরকারের পরিবর্তে, পুরোনো কাঠামোকেই পুনর্বাসন করা হলো এমন নানান কারসাজীর মাধ্যমে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত নির্বাচনের দিকে দেশকে ঠেলে দেয়াই ছিল ফ্যাসিবাদী দোসরদের টিকে থাকার প্রধান কৌশল। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে সামনে রেখে নির্বাচনমুখী চাপ সৃষ্টি করা হলো নতুন জন্ম নেয়া একটি শিশু সরকারের উপর, যাতে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও নিরাপত্তা খাতের পুনর্গঠন এসব মৌলিক প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যায়। ফলাফল হিসেবে দেখা যায় ১৭ বছর ধরে একদলীয় শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে যে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তা কার্যত অপরিবর্তিত অবস্থায় বহাল রয়েছে। এই কাঠামো ভেঙে না ফেললে কোনো নির্বাচনই প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে না এ বাস্তবতা ইচ্ছাকৃতভাবে অগ্রাহ্য করা হলো। সংস্কার বনাম নির্বাচনের বেড়াজালে একটি কৌশলগত বিভ্রান্তির পথে দেশকে ঠেলে দেয়া হলো।

নির্বাচন কমিশন ও কূটনৈতিক মিশনকে সামান্য এদিক সেদিক করে ধরে রাখা হলো ১৭ বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে সাজানো দোষরদের রেখে যাওয়া সেটআপকে, এ যেন পুরোনো বোতলে নতুন লেবেল। নানাবিধ চাপের ফলে নির্বাচন কমিশনে কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হলেও নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক চরিত্রের কোন পরিবর্তন দেখা যায়নি কোথাও বা বদলায়নি কিছুই। ভোটার তালিকা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা সবকিছুতেই পূর্বের ধারা বহাল রয়েছে আজো। ফ্যাসিস্ট সরকার চলে যাবার আগেও যে সকল সচিব বা উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের পেশনে নিয়োগ বা অবসর থেকে ফিরিয়ে এনে অস্থায়ী বা ২/৩ বছরের জন্য চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তাদের সকলকে রেখে দেয়া হলো অথচ দীর্ঘ ১৭ বছর পদ বঞ্চিত, নিঃগৃহীত সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদেরকে আটকে রাখা প্রমোশন অনুমোদন দিয়ে অবসরে পাঠিয়ে দেয়া হলো। এ যেন জুতা মেরে গরু দানের মতই। তাই এটিকে মূলত ‘রিফর্মের নাটক’ ছাড়া কিছু নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে, দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গঠনের দায়িত্বে থাকা হাইকমিশন ও কূটনৈতিক মিশনগুলোতেও কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়নি এখনও পর্যন্ত। ফলে ফ্যাসিবাদী আমলে যারা বিদেশে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেছে এবং একদলীয় শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে, তারাই এখনো বহাল রয়েছে এবং দিন দিন নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। দু‘একটি মিশনের প্রধানদেরকে সরিয়ে সাধারন মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। বাকী কর্মকর্তারা যথাযথ অবস্থানেই রয়ে গেছে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন অপশক্তিকে সক্রিয় করার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে সহিংসতার আশ্রয় নেয়ার ঘটনাও সামনে আসছে। ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তি হত্যাই নয়, এটি ভিন্নমত দমনের একটি রাজনৈতিক বার্তা বলেই অনেকের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। তার রেখে যাওয়া সহকর্মীদের নানাভাবে চাপের মধ্যে রাখা হয়েছে যাতে তারা মাথা উচুকরে দাড়াতে না পারে।  অথচ এই হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত আজও হয়নি এবং মানুষের কাছে এ ধরনের আচরন এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। যাকে অপশক্তির সক্রিয়করণ ও প্রতিবাদ দমনের রাজনীতি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ঠরা।

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিকে নানাভাবে সমর্থন, সহযোগীতা ও সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী আমলের অপকর্মগুলোকে ভুলিয়ে দেয়ার একটি স্পষ্ট প্রচেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন দেশের সাধারন মানুষ। নতুন রাজনৈতিক শক্তির ছত্রচ্ছায়ায় পুরোনো দোসররা নিজেদের পুনর্বাসনের পথ তৈরি করছে। ক্ষমতায় আসার আগেই তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার নামে ব্যাপক আয়োজন, তাদের ও পরিবারের সদস্যদের নামে স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণের উদ্যোগ রাজনৈতিক তোষণের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এটি একদিকে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার পরিপন্থী, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কাছে আনুগত্য প্রদর্শনের কৌশলমাত্র। সেইসাথে রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে জলাঞ্জলি দিয়ে ফ্যাসিবাদী স্টাইলে নির্বাচনী প্রচারনা চালানো ও ভারত তোষণ নীতি স্পস্টতা আধীপত্ববাদ বিরোধী জনতাকে কিভাবে পথ দেখাবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন দেশের আপামর জনতা। বিএনপি পুনর্বাসন ও ফ্যাসিবাদী দোসরদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করতে কাজ করছে এক শ্রেনীর কুচক্রী মহল। সকলকে নিয়ে স্বনির্ভর একটি দেশ গড়ার স্বপ্ন যেন স্বপ্নই হয়ে রয়ে না যায় এমন প্রশ্ন এখন দেশজুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। মানুষের দৃষ্টি এখন তাকিয়ে আছে ১২ ফেব্রয়ারীর নির্বাচনের দিকে। এদিকে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শক্তির সমন্বয়ে গঠিত ১১ দলীয় জোটের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিয়ে অপর পক্ষকে ক্ষমতায় আনার লক্ষ্যে কিছু অদৃশ্য শক্তির সক্রিয় ভূমিকার কথাও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা হস্তান্তরের ছক বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যেখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ক্ষমতার ধারাবাহিকতাই মুখ্য। এরই ধারাবাহিকতায় ১২ ফেব্রয়ারীর নির্বাচনকে বানচালের চেষ্টা হিসেবে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্টদের দোসরা বৃটেন সহ পশ্চিমা দেশগুলোতে নানাভাবে তাদের দেশবিরোধী প্রচারনা অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি বৃটিশ পার্লামেন্টে এক সেমিনারে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ও রেফারেন্ডাম নিয়ে আলোচনা হয় যেখানে নির্বাচনে হ্যা জয়যুক্ত হলে তা বাংলাদেশকে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন পরবর্তীতে দেশে মৌলবাদীদের উত্থান ঘটবে বলে সতর্ক করা হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর দেশে গুম খুনের সাথে জড়িতরা কিভাবে বিদেশে বসে এ ধরনের দেশবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অর্জন টেকসই করতে হলে কেবল নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীর সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হতে হবে অগ্রাধিকার। অন্যথায়, নাম বদলালেও শাসনের চরিত্র বদলাবে না, এমন আশঙ্কাই থেকে যাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি দলকে নানাভাবে সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আমলের কৃতকর্মগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে। নতুন রাজনৈতিক শক্তির আশ্রয়ে পুরোনো দোসররা নিজেদের পুনর্বাসনের পথ খুঁজছে।

এসব ঘটনা ও প্রবণতা মিলিয়ে একটি প্রশ্নই সামনে আসে জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনা কি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে? জুলাই গণআন্দোলন বাংলাদেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত, জবাবদিহিতা মূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার। কিন্তু যদি সেই আন্দোলনের ফল হিসেবে আবারও পুরোনো দোসরদের পুনর্বাসন ঘটে, তবে ইতিহাস একে ক্ষমা করবে না। আজ প্রশ্ন একটাই আমরা কি সত্যিকারের পরিবর্তনের পথে হাঁটব, নাকি নতুন মুখোশে পুরোনো ফ্যাসিবাদকেই মেনে নেব?

লেখক: প্রজন্ম তৌহিদ

সর্বশেষ খবর

Scroll to Top