আজ ১১ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫:০০
Lutfur Rahman

লুৎফুর রহমান চতুর্থবারের মত নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ টাওয়ার হ্যামলেটস, এটি ঐতিহাসিক সিটি অভ লন্ডনের ঠিক পূর্বপাশে টেমস নদীর তীরে অবস্থিত লন্ডনের পূর্বাঞ্চল। বৃটেনের অন্যতম বানিজ্যিক এলাকা ক্যানারি ওয়ার্ফ ও ইস্ট ইন্ডিয়া ডক্‌স এই বরার অন্তর্গত। টাওয়ার হ্যামলেটস কেবল পূর্ব লন্ডনের একটি প্রশাসনিক বারা (Borough) নয়, এটি সংগ্রাম, সংহতি এবং বহুসংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। এখানে মিশে আছে অভিবাসী শ্রমজীবী মানুষের জীবন সংগ্রামের ইতিহাস। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন এবং নানা সংস্কৃতির সহাবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। সংগ্রাম থেকে সফলতায় রূপান্তরের এই ইতিহাস এখানে দৃশ্যমান। ৭০ ৮০‘র দশকে বর্ণবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের প্রতিরোধ এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ঘাঁটি ছিল এই টাওয়ার হ্যামলেটস। বর্তমানে এটি একটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এলাকা, যেখানে বাংলাদেশী সংস্কৃতির সাথে বৃটিশ সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। তাই একে ব্রিটিশ-বাংলাদেশী সংস্কৃতির হৃদপিণ্ড বলা হয়ে থাকে।

ব্রিক লেনের ব্যস্ততা, হোয়াইটচ্যাপেলের জনজীবন, বেথনাল গ্রীনের আবাসন সংকট এবং ক্যানারি ওয়ার্ফের উঁচু ভবনের পাশেই নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা, সব মিলিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটস বহুদিন ধরেই ব্রিটিশ রাজনীতির একটি সংবেদনশীল ও প্রতীকী এলাকা। সেই এলাকাতেই আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নতুনভাবে উঠে এলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র লুৎফুর রহমান।

গত ৭ মে ২০২৬ বৃটেন জুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে অন্যতম টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচন। সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে বিরতিহীন ভোট গ্রহণ। পরদিন ৮ মে শুক্রবার সকাল থেকে ভোট গণনা শুরু হয় পূর্ব লন্ডনের এক্সেল (ExCeL) সেন্টারে। এ নির্বাচনে অ্যাস্পায়ার পার্টির প্রার্থী লুৎফুর রহমান ৩৫,৬৭৯ ভোট পেয়ে নির্বাহী মেয়র পদে চতুর্থবারের মত নির্বাচিত হন। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এই নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ছিল ২,১৯,০৩০ এবং ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪২.১ শতাংশ।

এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে লুৎফুর রহমান চতুর্থবারের মতো টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলাম পেয়েছেন ১৯,৪৫৪ ভোট। গ্রিন পার্টির হিরা খান আদেয়োগুন পেয়েছেন ১৯,২২৩ ভোট। অর্থাৎ লেবার ও গ্রিন প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র ২৩১ ভোট। এই ফলাফল শুধু লুৎফুর রহমানের ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের লেবার প্রভাবিত পূর্ব লন্ডনের রাজনীতিতে একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

টাওয়ার হ্যামলেটস বরাবরই লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এবারের ফলাফলে দেখা যায়, স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন, আবাসন, শিক্ষা, যাতায়াত, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কমিউনিটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। লুৎফুর রহমান এই জায়গাতেই নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্ত করেছেন। তাঁর প্রচারণার কেন্দ্রে ছিল সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, নিম্ন আয়ের পরিবারের সংকট এবং আবাসন সমস্যার বাস্তবতা।

লুৎফুর রহমানের এই সাফল্যের পেছনের গল্পটি সংগ্রামের। ১৯৬৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সিকান্দরপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান এবং মা মজিদুন নেসার হাত ধরে খুব অল্প বয়সেই তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। ইস্ট এন্ডের বৈরী পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতেই তাঁর রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। তিনি লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের স্থানীয় বো অঞ্চলের ম্যানর প্রাইমারি স্কুল, ল’ডেল জুনিয়র এবং বো স্কুলে পড়াশুনা করেন। স্কুল জীবন শেষে তিনি সিটি ইউনিভার্সিটি লন্ডন থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৯৭ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ‘ল সোসাইটির সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে সলিসিটর এবং ফ্যামিলি ল‘ইয়ার হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন।

তিনি ২০০২ সালে লেবার পার্টির হয়ে স্পিটালফিল্ডস ও বাংলাটাউন ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের লিডার হন। ২০১০ সালে তিনি লেবার দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও অজানা কারনে তাকে বেশ কয়েকবার দল থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। শেষ মূহুর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দিতা করে তিনি ব্রিটেনের প্রথম মুসলিম ও অশ্বেতাঙ্গ নির্বাহী মেয়র হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন। বিজয়ী হওয়ার পরও তাঁর রাজনৈতিক পথচলা বিতর্কমুক্ত ছিল না। ২০১৫ সালে নির্বাচনী অনিয়ম সংক্রান্ত আদালতের রায়ের পর তিনি পদ হারান এবং পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন। যদিও তৎকালীন সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার নিয়োজিত রাস্ট্রীয় তদন্তকারী সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তিন দফা তদন্ত করেও কোন প্রমান খুজে না পাওয়ার ঘোষনা দেয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে অ্যাস্পায়ার পার্টির হয়ে তিনি আবারও স্থনীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে রাজসিক প্রত্যাবর্তন ঘটান। আর ২০২৬ সালের নির্বাচন ছিল তাঁর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল আস্থার পুনর্নিশ্চয়তা, আর বিরোধীদের কাছে ছিল তাঁর জনপ্রিয়তার পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত ফলাফল বলছে, টাওয়ার হ্যামলেটসের বড় একটি অংশ এখনও লুৎফুর রহমানের স্থানীয় নেতৃত্ব, সামাজিক কর্মসূচি ও জনমুখী রাজনীতির প্রতি আস্থা রেখেছে।

এবারের প্রচারণায় লুৎফুর রহমানের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমানো। তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকারে বলা হয়েছে, টাওয়ার হ্যামলেটসে নিম্ন আয়ের পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যয়ে বিশেষ সহায়তা দেয়া হবে। লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড ও বাসে যাতায়াতের খরচ কমাতে এমন প্রতিশ্রুতি তরুণ প্রজন্ম ও তাদের পরিবারকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। লুৎফুর রহমান কেবল একজন স্থানীয় রাজনীতিবিদ নন, তিনি ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর এই চতুর্থ দফার বিজয় টাওয়ার হ্যামলেটসের সীমানা ছাড়িয়ে ব্রিটিশ বাংলাদেশি ডায়াসপোরা এবং অভিবাসী কমিউনিটির রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের আলোচনাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে।

লুৎফুর রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে রয়েছে কম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ট্রাভেল পাস চালুর পরিকল্পনা (প্রস্তাব অনুযায়ী, কাউন্সিল শিক্ষার্থীদের জন্য Transport for London (TfL) এর নেটওয়ার্কে ব্যবহারের উপযোগী ট্রাভেল পাসের অর্থায়ন)। বর্তমানে লন্ডনে শুধু ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বাসে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। নতুন পরিকল্পনার আওতায় নির্ধারিত আয়সীমার নিচে থাকা পরিবারের সব শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে। আয়সীমা ও পাসের মেয়াদ TfL-এর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। যা বাস্তবায়িত হলে টাওয়ার হ্যামলেটস হবে দেশের প্রথম কাউন্সিল যারা এমন উদ্যোগ নেবে।

নির্বাচিত হয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, “আমাকে পুনর্নির্বাচিত করার জন্য টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণকে ধন্যবাদ। আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় যুগান্তকারী সহায়তা এবং সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন নির্মাণের রূপান্তরমূলক কর্মসূচি অব্যাহত রাখবো। আশা ও ঐক্যের রাজনীতিকে ভয় ও বিভেদের রাজনীতির ওপর প্রাধান্য দেয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। টাওয়ার হ্যামলেটসে আমরা গর্ব করি যে এটি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ এলাকাগুলোর একটি। আমরাই দেশের প্রথম কাউন্সিল যারা সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য সার্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল চালু করেছি, এবং জাতীয় সরকারের কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত উল্টে দিয়ে বাতিল করা Education Maintenance Allowance (EMA)পুনর্বহাল থেকে শুরু করে সরকারের কাটা Winter Fuel Payment ফিরিয়ে এনেছি। আমরা একসঙ্গে যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত। আমি আশা করি আজ নির্বাচিত নতুন প্রগতিশীল প্রশাসনগুলো আমাদের পথ অনুসরণ করবে, একই ধরনের রূপান্তরমূলক নীতি গ্রহণ করবে এবং আমাদের কমিউনিটির জন্য বাস্তব পরিবর্তন আনতে একসঙ্গে কাজ করবে।

সিলেটের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে পূর্ব লন্ডনের জনজীবনে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ আজ লন্ডনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটি অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম, আত্মপ্রতিষ্ঠা এবং সম্ভাবনার এক অর্থবহ গল্পই শুধু নয় এখন এটি বাস্তবতা। তবে এই বিজয়ের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে আগামী দিনে তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনে সফলতা আনায়নের মাধ্যমে। লুৎফুর রহমানের এই ভূমিধ্বস বিজয় শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি জনআস্থা, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং অভিবাসী কমিউনিটির রাজনৈতিক সক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

সর্বশেষ খবর

Scroll to Top